Ashraf
Hafsana Tapadar에 의해একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। এক দুদিন করে সে আজ বেশ কদিনই। আজ প্রশান্তের ব্যাগ থেকে টাকা চুরি গেল। প্রশান্ত নালিশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ক্লাস টিচার মহেন্দ্র মাস্টার তো রেগে একেবারে আগুন। হবেনই তো। মাত্র দুদিন আগেই তো তিনি সকলকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি ভীষণ গর্জে উঠলেন।
'তোদের পই পই করে বলেছিলাম, স্কুলে আসার সময় বেশি টাকা নিয়ে আসবি না। দরকার না-থাকলে একদম আনবি না।'
'স্যার দুটো খাতা কেনার ছিল।' প্রশান্ত সাফাই দেবার চেষ্টা করে। তার কথায় ভূক্ষেপ না-করেই তিনি বলে গেলেন-
'তোদের আমি বলেছিলাম যে চোর যদি ধরা পড়ে, তবে এই স্কুল ছেড়ে তাকে পালাতে হবে। এ স্কুলে চোরের কোনো স্থান নেই।'
এবার তিনি ছাত্রছাত্রীদের দিকে অগ্রসর হলেন। এবং একধার থেকে একে একে সকলের স্কুল ব্যাগ ও পকেট চেক করা শুরু করলেন। সিদ্ধার্থের ব্যাগ খুলেই মহেন্দ্র মাস্টার তার মুখের দিকে খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ব্যাগে দুখানা পঞ্চাশ টাকার নোট ও আরও কিছু নোট। প্রশান্তেরও দুটি পঞ্চাশ টাকার নোট হারিয়েছে।
'এ আমার নিজের টাকা। মা আমাকে দিয়েছেন।'
'ফাঁকি মারছিস?' মহেন্দ্র মাস্টার গর্জে ওঠেন।
'সংসারে কি পঞ্চাশ টাকার নোট শুধু দুখানাই', চোখে চোখ রেখে সিদ্ধার্থ প্রায় ফেটে পড়ল। রাগে তার শরীর রীতিমতো কাঁপছে।
সবাই হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। ওদের ক্লাসে কেউই আজ পর্যন্ত শিক্ষকের প্রতি এমন রূঢ় আচরণ করেনি। মহেন্দ্র মাস্টারের মতো কড়া শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে এ ধরনের কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। গোটা ক্লাসে বিরাজ করছে নিঃশব্দতা। মাস্টার কোনোক্রমে নিজেকে সামলে অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন-
'ঠিক আছে। কিন্তু যেদিনই বামাল শুদ্ধ ধরা পড়িস, এই স্কুলে সেদিনই হবে তোর শেষ দিন এটা জেনে রাখিস।'
(২)
ইচ্ছে করেই নির্মল খানিকটা দেরি করে স্কুলের গেটের বাইরে বেরিয়ে এল। কি একটা কৌতূহল এবং সন্দেহের বশবর্তী হয়েই সে পান দোকানটির দিকে এগিয়ে গেল। অনুমান অনুযায়ী সে সিদ্ধার্থকে পানদোকানে পেয়ে গেল। নির্মল ওকে প্রায়ই এই পানের দোকানে দেখতে পায়। দু একদিন দোকানের আড়ালে লুকিয়ে সিদ্ধার্থর সিগারেট খাওয়াও নির্মল লক্ষ করেছে। প্রথম বার দেখে সে থতমত খেয়ে গেছিল। ওদের মতো ছোট ছেলেপিলেকে সিগারেট খেতে নির্মল এর আগে কখোন দেখেনি।
এই দোকানদারকে নির্মলের কেন জানি মোটেই ভাল লাগে না। দোকানে যে-সব ছেলেমেয়েরা যায় তার মনে হত দোকানদার যেন খুব মন দিয়ে ওদের নিরীক্ষণ করে। নির্মলকেও এভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। পরে একদিন তার কথা জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার মা, বাবা, বোনের সম্পর্কে জানতে চাওয়া কথাগুলোয় সে তিলমাত্রও আন্তরিকতার সন্ধান পায়নি। বরং অন্যের হাঁড়ির খবর জানার অতিরিক্ত আগ্রহ নির্মলের চোখে লোকটিকে কিছুটা বিচিত্র রহস্যময় করে তুলেছিল। পারতপক্ষে সে আজকাল ওই দোকানে আর যায় না। এই দোকানদারের সঙ্গে সিদ্ধার্থেরই বা কি এমন কথা বলার আছে। সে-কথা অবশ্য নির্মল কস্মিনকালেও জানতে চায়নি। হয়তো সিদ্ধার্থের বেপরোয়া স্বভাবের জন্যেই, অন্যদের মতো নির্মলও সিদ্ধার্থকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল।
কিন্তু সিদ্ধার্থ আগে কিন্তু অমনটা ছিল না। ও তাদের সঙ্গে হাসি খেলায় দিব্যি মজে থাকত। আজ ক'মাস ধরেই সে গম্ভীর খিটখিটে আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বন্ধুদের কাছ থেকে পালিয়ে ক্লাসে পিছনের বেঞ্চিতে বসতে শুরু করেছে। শিক্ষকদের দেওয়া হোমটাস্ক প্রায়ই করছে না, এমনকী মাঝে মাঝে স্কুলও কামাই দিচ্ছিল। নির্মল এ-কান সে-কান করে সিদ্ধার্থের মা-বাবা সম্পর্কে বেশ কিছু কথা জানতে পেরেছে। ভেবেছে তার এই পরিবর্তন বোধকরি সে-সব কারণেই হয়েছে। হয়তো সে-সব কথা সত্যিও। কিন্তু এই রহস্যময় দোকানটিতে সদ্ধার্থর সঘন উপস্থিতি নির্মলকে এক জটিল ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিল। এই ধাঁধা, আর এই রহস্যের সমাধান তার করা চাই। একটা রহস্যের গোলোকধাঁধায় একজন বন্ধুকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। কেবল পড়ালেখায় ভালো হলেই প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় না।
নির্মল দোকানটির দিকে এগিয়ে গেল।
(৩)
'কি চাই? ' দোকানদারের কণ্ঠস্বরে ফুটে ওঠা বিরক্তির ঝাঁঝ বুঝে নিতে নির্মলের অসুবিধে হয়নি।
'সিদ্ধার্থকে চাই।' নির্মল পরোয়াহীন উত্তর ছুঁড়ে দেয়। এবার সে সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে প্রায় কর্তৃত্বের সুরে বলে ওঠে-
'তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।'
হয়তো দায়িত্ববোধই কর্তৃত্ব প্রধান করে। সেই কর্তৃত্বজাত নির্দেশের সুরে সিদ্ধার্থের মতো গুরু-গোসাঁই না-মানা ছেলেও দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্মলের পেছন পেছন সে পা ফেলে। দোকানের অদূরে নির্মল দাঁড়িয়ে। কোনোরকম ভূমিকা না-করেই নির্মল তাকে প্রশ্ন করে।
'প্রশান্তের টাকা কেন চুরি করেছিলি?'
'তোরা সবাই কেবল আমাকেই কেন সন্দেহ করছিস?' সিদ্ধার্থ নিজেই টের পাচ্ছে তার কথায় কোথায় যেন জোর কমে গেছে। তাতে আত্মবিশ্বাসের চিহ্নমাত্র নেই। তবুও সে শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করে দেখল-
'আমি চুরি করিনি।'
'আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল।' নির্মলের কথায় তার অজান্তেই যেন কিছুটা কোমলতা মিশে গেল।
'তোর চোখের দিকে চাইতে না-পারার তেমন কি আছে?' মাথা নাবিয়ে সিদ্ধার্থ বলে গেল।
কয়েকটি মুহূর্ত অস্বস্তিকর নীরবতায় পার হয়ে গেল। নির্মল লক্ষ করল মহেন্দ্র মাস্টারের চোখে চোখ রেখে ভেংচে ওটা বেপরোয়া ছেলেটি যেন তার সম্মুখে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে।
'তোর কি হয়েছে আমাকে বলবি?'
না, সিদ্ধার্থ কিছুই বলেনি। সে কোনো কিছুই বলতে চায়নি। বলতে পারবেও না। কি হল কিজানি-নির্মল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিদ্ধার্থ সামনের চলন্ত সিটিবাসের পেছনে ছুটতে শুরু করল। একটা সময় সে ঝাপ দিয়ে বাসের পা-দানিতে ঝুলে পড়ল। নির্মলের গলা সে ঠিকই শুনতে পেল-
'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।'
(8)
সিদ্ধার্থ এক সপ্তাহ স্কুলে যায়নি। যেতে তার সাহস হয়নি। নির্মলের কথাগুলি তার যন্ত্রণাদগ্ধ বুকের মধ্যে সংগীতের মতো বেজে চলেছে।
'তোর কি হয়েছে তা আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ!'
এই কথাগুলি যারা বলতে পারে সে-সব মানুষজন সিদ্ধার্থের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। না-পাওয়া ভালবাসার আশা যেন তাকে দুর্বল আর অভিমানী করে। কার ওপর এই অভিমান সিদ্ধার্থ যেন নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।
মহেন্দ্র মাস্টারের কর্কশ কঠোর বাক্যবাণের মুখোমুখি হওয়া যেন সহজ- তার মতো বেপরোয়া দুরন্ত একটা ছেলের পক্ষে চোখে চোখ রেখে আক্রমণের প্রত্যুত্তর দেওয়া সহজ, কিন্তু নির্মলের মতো ছেলের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। ওর মতো ছেলের কথার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়, বরং অস্বস্তিকর মৌনতায় শুধু ছটপটানোই সার।
নির্মলের মুখোমুখি হবার জন্যে সিদ্ধার্থের খানিকটা মানসিক প্রস্তুতির দরকার।
নির্মলের সঙ্গে মুখোমুখি হবার ভয় না কি নির্মলের কথাগুলি যে-প্রবল প্রতিরোধের সঞ্চার করছে সে-জন্য তা ঠিক ও বুঝে উঠতে পারছে না। সে এক সপ্তাহ ওই পান দোকানে যেতে পারেনি। হয়তো এই জন্যেই পুরনো বিষাদের দহন বেড়েছে, বেড়েছে অস্থিরতাও; কেনো এক অনিশ্চয়তা ও ভীতির ভাব প্রবল আকার ধারণ করে যেন তাকে গ্রাস করার জন্যে অহরহ তাড়া করছে। সিদ্ধার্থ ভেবে দেখল ইদানীং তার হাত পায়ের কাঁপুনি যেন বেড়ে উঠেছে।
পান-দোকানি নির্মল ও অন্য যে-সকল লোক তার আপন ছিল, সবাই আপন হয়ে থাকা উচিত ছিল।
সেইসব মানুষের ভিন্নমুখি টানাপড়েন আর দুঃসহ স্মৃতির ভারে সে বিছানায় পড়ে ছটপট করছে। একা। ঘরের মৃত্যুশীতল নির্জনতায় সে ডুবে থাকে আজকাল। তার বুকের মধ্যে সঞ্চিত কয়টি শব্দ যেন চৌচির করে ফেলছে তার নিজের নিসঙ্গ নির্জন জগৎকে-
'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।'
ক্লাসে ঢুকেই মহেন্দ্র মাস্টার ছাত্রছাত্রীদের মুখগুলোয় একবার চোখ বোলালেন নীরবে। তারপর একটা যেন তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বললেন- 'ওই বজ্জাতটা আজও স্কুলে আসেনি। চোর ধরা পড়ে এখন লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে না।'
নির্মলের মনটা এ কথা শুনে যেন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেল। কিছু একটা বলতে গিয়েও সে থেমে গেল। মানুষের দেখা ঘৃণ্য সত্যের আড়ালেও হয়তো লুকিয়ে থাকে অন্য কোনো করুণ সত্য। সেইসবই সে খুঁজে ফিরছে। খুঁজে সে বের করবেই।
(৫)
কোঠাটির ভেতরে আঁজলা অন্ধকার। বিছানা ছেড়ে লাইট জ্বালাতে সিদ্ধার্থের ইচ্ছে হচ্ছিল না। মা বোধকরি এখনো ফেরেননি। আজ এতগুলো দিন সে স্কুলে যাচ্ছে না। তা নিয়ে মায়ের কোনো মাথাব্যথা নেই। একদিন শুধু জিগ্যেস করেছিলেন, 'স্কুলে যাবি না?' সে শরীর ভালো নেই বলে কথায় ইতি টেনে দিয়েছিল। তার মা এতটাই আশ্বস্ত হয়েছিলেন যে তাকে আর দ্বিতীয় বারের জন্যে জিগ্যেস করেননি। না, না, তার অভিমান হয়নি। যে-সকল আঘাত ও দুঃখ প্রাত্যহিক হয়ে পড়ে, তারা একসময় হয়তো মানুষকে অভিমানী করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে বই-কি।
বাবা তাদের ছেড়ে গেছেন বোধকরি দুবছর হল। বোঝার বয়স হবার পর থেকেই সে দেখে আসছিল মা ও বাবার মধ্যেকার দুর্বাদল বচসা। প্রচণ্ড চেল্লামেল্লি, উপচে পড়া তীক্ষ্ণ গালিগালাজের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে সে নির্বাক চেয়ে থাকত মা ও বাবার প্রস্তরকঠিন দুখানি মুখের দিকে। মা না বাবা কার পক্ষ সে নেবে- সেই নিদারুণ প্রশ্নের আঘাতে অবিরত রক্তক্ষরণ হত তার কোমল হৃদয়ে। বিনিদ্র রাতগুলোয় কত কত না চোখের জল তার চোখে শুকিয়ে গেছে- সেইসব চোখের জল মুচে দেবার মতো মায়ের হাতের কোমল স্পর্শ যেন চিরকালের মতো কোথায় হারিয়ে গেল। বাবারও।
এবং একদিন বাবা তাদের দুজনকে এই ঘরে একলা ফেলে কোথায় যে চলে গেলেন।
মা বাবার মধ্যে কি এমন এক প্রচণ্ড, অমোঘ অমীমাংসিত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল, যে প্রশ্ন তাঁদের নিজের সন্তানকেও দুঃখ যন্ত্রণার অতল এবং পারাপারহীন সাগরে নিক্ষেপ করার হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি? এসেছিলেন। সপ্তাহ-পনেরো দিনের মাথায়। স্কুল ছুটির পর বাবা এসে তার সঙ্গে দেখা করতেন। নানা রকমের চকোলেট নিয়ে আসতেন বাবা। ঘরে ফিরে এসে যখন সে চকোলেটে কামড় দিত, চকোলেটের স্বাদ তার জিবে লাগার আগে তার দুচোখ ভরে যেত জলে। অবাধ্য সেই অশ্রুধারা নীরবে ঝরে পড়ত অঝোরে।
মা বাবার কি সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন, যা তার চোখের জলের চেয়েও বহুগুণে ভারী।
অল্পদিনের মধ্যেই বাবার দেওয়া চকোলেটের জমানো কাগজে ভরে গেছিল সিদ্ধার্থর একটা পেন্সিল বাক্স। তার চেয়েও দ্রুত ভরে গেছিল তার বুক- অসহনীয় শূন্যতায়- হাসতে না-পেরে, খেলতে না-পেরে, ঘুমোতে না-পেরে- এতটাই গম্ভীর ছিল সেই শুন্যতার ভার, দুঃখের দহন।
এবং একদিন সে বাবাকে বলেছিল- 'তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো না।'
বাবার মুখের দিকে সে তাকাতে পারেনি, তার ভয় করছিল- বাবার চোখের কোণায় জমাট বাঁধা জল যদি তাকেও অস্বস্তিতে ফেলে।
'কিন্তু কেন?'
বাবার প্রশ্নের উত্তর সে দেয়নি। বাবাকে সে কোনোদিন জিগ্যেসও করেনি- কেন তাকে ছেড়ে তিনি চলে গেছেন!
(৬)
কথাগুলো কোথা থেকে কি হয়ে গেল, তাতে যেন সিদ্ধার্থের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দাঁড়হীন নৌকোয় যেন সে ভেসে বেড়াচ্ছিল। নদীর স্রোত ও ঝড়ের দাপট লেগে নৌকো যেখানে যায়, তাই যেন ছিল তার গন্তব্য। আছে, সব কথাই তার মনে আছে। বাড়িতে তার কিছুই ভালো লাগত না। স্কুল ছুটির পর এদিক-সেদিক ঘুরে বেশ দেরি করেই সে ঘরে ফিরত। তার প্রতি মায়ের মনোযোগ কমে গিয়েছিল। কখনো মা কোনো কথা জিগ্যেস করলে সে বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠত। হয়তো মায়ের প্রতি তার প্রচুর আক্রোশ ছিল। প্রাপ্য স্নেহমমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে একটা ভাঙা সংসারে সে বিদ্রোহী রূপে পরিগণিত, অথচ করুণ চরিত্র।
সকল অবলম্বন হারিয়ে সে খুঁজে ফিরছিল একটা অবলম্বন, নিরাশ্রয় হয়ে সন্ধান করছিল কারুর যৎসামান্য স্নেহ; ডুবন্ত মানুষের মতো দুহাত মেলে সে খুঁজছিল একটু খড়কুটো।
এই সময় সে সাক্ষাৎ পায় এই পান-দোকানির। তার সঙ্গে কথা বলে সে বহু সময় অতিবাহিত করত। দোকানদারের সামান্যতম স্নেহের স্পর্শে উথলে উঠেছিল তার বুক। আর বুক উজাড় করে সে বলে গেছিল তার দুঃখের কাহিনি। এবং এভাবে একদিন দোকানি তার হাতে তুলে দিয়েছিল একটা সিগারেট। প্রথমত সে খেতে চায়নি। লোকটি তাকে প্রলুব্ধ করেছিল- 'খেয়ে দেখো তো দেখবে তোমার দুঃখ বেশ অনেকটাই কমে গেছে, মনটা বেশ ফুরফুরে লাগবে।'
কাঁপা আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা গলিয়ে সে মনের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এমনই একখানি মুখের ছবি, যা দেখামাত্রই সে ফেলে দিতে পারবে এই সিগারেট। খুঁজে সে পায়নি। সিগারেটটা শেষ হবার খানিকক্ষণ বাদে সে অনুভব করে, তার শরীরের ভেতর খেলে বেড়াচ্ছে একটা উল্লাসের ঢেউ- সেই ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার সঞ্চিত যত দঃখের ভার! কোনোকালেই অনুভব না-করা একটা প্রগাঢ় প্রশান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল তার দেহ মন।বহুদিন পরে সেদিন রাতে তার ভাল ঘুম হয়েছিল। পরদিন সকালবেলা জেগে ওঠার কয়েক ঘন্টা পরেই সে অস্থির হয়ে পড়েছিল। পুরনো দুঃখ, যন্ত্রণাগুলো যেন এবার আগের চেয়ে সুতীব্র হয়ে উঠছিল। দ্বিতীয় একটি সিগারেটের জন্যে সে অস্থির পাগল হয়ে যাচ্চিল। এবং সেই পানের দোকানে এসে উপস্থিত হল। দোকানদার তার দিকে চেয়ে মিচকে হেসেছিল। সেই হাসি ওর মোটেই ভালো লাগেনি; কিন্তু সেই হাসিকে ঘৃণা করবার মতো সাহস যোগাতে পারে, এমন স্নেহময় হাতের স্পর্শ তখন তার কাঁধে ছিল না।
খুব দ্রুত সিদ্ধার্থ বুঝে গেছিল সিগারেটগুলোতে তামাকের সঙ্গে মিশ্রিত আছে নিষিদ্ধ ড্রাগস। ইতিমধ্যেই সে নেশাসক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিন দোকানদারটি তাকে বললে- 'এইগুলোর অনেক দাম। নিয়ে আসাটাও ঝুঁকি সাপেক্ষ, পুলিশের ঝামেলা আছে। এখন থেকে পয়সা দিবে, জিনিস নিয়ে যাবে।'
একদিন ওর মা বাথরুমে স্নান করতে ঢুকলে ও মায়ের হাতের সোনার বালা চুরি করে নিয়েছিল। যখন সেই সোনার বালা পান দোকানির হাতে তুলে দিয়েছিল, ঠিক সেই সময় পুলিশ এসে তাদের বাড়ির কাজের মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে লক আপে ভরে দেয়। অন্তর্দ্বন্দ্ব হয়েছিল ওর খুব। ভাল-মন্দ, ভুল-শুদ্ধ, কাজের মেয়েটির করুণ মুখ আর নেশার প্রতি তীব্র আসক্তি- এই সবকিছুর টানাপড়েনে একটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সে অনুভব করছিল- তার ভেতরকার মানুষটার মৃত্যু হয়েছে। আজকাল সে এসব কিছু মোটেই ভাবে না। মায়ের দেওয়া হাত খরচ, একটু অসাবধানতায় এখানে সেখানে রাখা মায়ের টাকা চুপিসাড়ে সরিয়ে নিয়ে দোকানির হাতে তুলে দেয়। মাঝে মাঝে সহপাঠীদের ব্যাগও তাকে হাতড়াতে হয়।
অন্ধকার হাতড়ে বালিশের পাশে রাখা পেন্সিল বাক্সটা সে হাতে তুলে নেয়। এই বাক্সে সে বড় যত্ন করে বাবার দেওয়া চকোলেটের লেবেলগুলো জমিয়ে রেখেছিল। বাক্সটি খুলে ভেতরটা ছুঁয়ে দেখছিল- সিগারেট, গুটি ট্যাবলেট সবই প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছিল। বহুদি সে পান দোকানটিতে যায়নি। এখনো পর্যন্ত স্কুলে যাবার কথা ভেবে দেখেনি। কাল কি সে একবার পান দোকানে... 'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।' অন্ধকারের অতল থেকে হঠাৎ যেন ওপরে ভেসে উঠতে চাইছে নির্মলের কণ্ঠস্বর।সিদ্ধার্থ বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখতে পেল অন্ধকার কোঠাটির ভেতরে একটা ক্ষুদ্র জোনাকি। হয়তো সিদ্ধার্থের অজান্তেই খোলা ছিল কোনো একটি জানালা। হয়তো সেখান দিয়েই ওই জোনাকি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। আর ইতস্তত উড়ে উড়ে অন্ধকার ঘরটিতে তৈরি করছিল একটি-দুটি করে অজস্র আলোর বিন্দু।
(৭)
সিদ্ধার্থর বাড়ি কেউ চেনে না। আজ অবধি কেউই তার বাড়িতে যায়নি। যেতে চাইলে সিদ্ধার্থ নিয়ে যেতে অস্বীকার করত। বাধ্য হয়ে নির্মল স্কুল ছুটির পর পানদোকানটির দিকে পা বাড়াল। নির্মলকে দেখেই দোকানদারের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। দোকানের সামনে বাইকের ওপর যে দুটো ছেলে বসেছিল তারাও যেন তাকে সন্দেহের চোখে জরিপ করছে। 'সিদ্ধার্থ কি এসেছিল?'- অস্বস্তি নিয়ে নির্মল দোকনদারটিকে জিগ্যেস করে। 'না আসেনি। আজ বেশ কিছুদিন ধরে আসছে না।'- চেপে রাখা সত্ত্বেও দোকানির মুখ থেকে কথাগুলো স-ক্ষোভে বেরিয়ে এল। নির্মল যখন সেখান থেকে ফিরে আসছিল, দোকানি আবারও বলে ওঠে- 'কাজ না-থাকলে এখানে এসে বিরক্ত করিস না।'- কথাটা সাবধান বাণীর মতোই শোনাল।
নির্মল বাইরে এল। হেঁটে স্কুলের গেট পার হবার পর আচম্বিতে ঘটনাটা ঘটে গেল। নির্মলের গায়ের কাছাকাছিই আসতেই বাইকের গতি কমে এল, এবং বাইকের পেছনে বসা ছেলেটি প্রচণ্ড জোরে ওর মুখে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। নির্মল কিছু করে উঠবার আগেই বাইকটা মুহূর্তে ছুটে গিয়ে সামনের বাঁকের দিকে অদৃশ্য হয়ে গলে। নির্মলের নাক ভেঙে গিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মুখে হাত দিয়ে সে পথের পাশেই বসে পড়ে।
রাস্তার ওপারে সিটি বাস থেকে নেমেই সিদ্ধার্থ ঘটনাটা দেখতে পায়। দৌড়ে সে নির্মলের কাছে চলে আসে-
'কে তোকে মেরেছে?'
'পান দোকানটায় গেছিলাম। সেখান থেকে ফেরার সময়- হয়তো দোকানের সামনে বাইকে বসে থাকা ছেলে দুটিই- ওই দোকানদার লোকটা বিশেষ সুবিধের নয় বুঝলি'- এক শ্বাসে কথাগুলো নির্মল বলে ফেলে।
'দোকানে তুই গেলি কেন?'- ভীষণ রাগে ফুঁসছিল সিদ্ধার্থ।
'তোর খবরে গেছিলাম'
'যাবি না ওখানে, কক্ষনো যাবি না।'
'তুই যাস বলেই তো যেতে হল'
সিদ্ধার্থ চুপ মেরে গেল। বলার জন্যে দু-চারটে শব্দ খুঁজে সে কাহিল হয়ে গেল। সুতীব্র যন্ত্রণায় উচ্চারিত
কয়েকটি শব্দ সিদ্ধার্থের কানে এসে লাগে-
'তুই আমাকে খুঁজে এসেছিস, না পান দোকানের উদ্দেশ্যে এসেছিস?' সিদ্ধার্থ লক্ষ করল, মুখ হাতখানা সরিয়ে নির্মল উত্তরের আশায় উৎকণ্ঠায় তারই মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর নাকটা বেশ ফুলে উঠেছে। নাক দিয়ে তখনো রক্ত ঝরছিল।
'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।'- ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নির্মল আবারও ওই কথাগুলি বলে গেল।
সিদ্ধার্থ লক্ষ করল- রক্তে লাল হয়ে আছে নির্মলের দুই হাত। যন্ত্রণায় রীতিমতো কাঁপছে।
(৮)
আজ অনেকদিন পরে সিদ্ধার্থ পড়ার টেবিলে বসেছে। কিন্তু পড়ায় সে মোটেই মন বসাতে পারছে না।
কেবল খালি পেন্সিল বাক্সটি নেড়ে চেড়ে খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সেই জায়গাটা ডোবা জলাভূমি। কাদাভর্তি। শিগগিরই হয়তো সেখানে গজিয়ে উঠবে একটা ফ্ল্যাটবাড়ি। জলাভূমির কচুবন ঘিরে উড়ে চলেছে অসংখ্য প্রজাপতি। জ্বলছে নিভছে তাদের চিকমিকানো আলো। এ রকম তুচ্ছ সামান্য দৃশ্যাবলি কতদিন সে চোখ তুলে দেখেনি তার ইয়ত্তা নেই। শূন্য পেন্সিল বাক্সটি একবার দেখল। সঙ্গে সঙ্গে তার নির্মলের কথা মনে পড়ল। কী দরকার ওর তার খোঁজে সেই পান দোকানটায় যাওয়ার? কী দরকার ওর সেইসব কথাগুলি জানবার? কী লাভ ওর এতে? সিদ্ধার্থের চোখের সামনে ভেসে উঠল নির্মলের রক্তাক্ত মুখের ছবি। লাভ-লোকসানের হিসেবের বাইরেও অন্য একটা পৃথিবী কি আছে সংসারে?
সেই পৃথিবীর সন্ধানে যেন একবার নির্মলের কাছে যেতে তার মন উসখুস করছে।
(৯)
• বিলম্বিত লয়ে শহরে সন্ধ্যা নামছে। সামনে নদী নিয়ে বসে আছে ছন্নছাড়া আলোয়, নির্মল ও সিদ্ধার্থ। ধীর শান্ত গতিতে নদী বহে চলেছে।
কোনো এক অচনা পাখি সোঁ করে যেন ঠোঁট দিয়ে সেই নদীর জল ছুঁই-না-ছুঁই করে আবারও উড়ে গেল উপরে। নাহ্ সিদ্ধার্থর পক্ষে এসব এখন এক অচেনা জগৎ। এমনকী ডুবন্ত হিঙ্গুল বর্ণের দিনমণিও তার বড় একটা চেনা ঠেকছে না। শান্ত মৃদুস্বরে সিদ্ধার্থ বলে-
'হয়তো জীবনটাই আমাকে প্ররোচিত করলে?'
নির্মল ওর কথার স্রোতে বাধা দেবার প্রয়োজন বোধ করল না। বলুক- সিদ্ধার্থ বুক উজাড় করে তার কথাগুলো বলে যাক। বুকটা তার এই করে জুড়োক। একটু থেমে সিদ্ধার্থ আবার বলতে শুরু করল-'রূপকথা শুনতে খুব ভালেবাসতাম জানিস! কিন্তু গল্প বলারই তো কেউ ছিল না।'
শৈশবের যে-দিনগুলোতে নির্মলরা মা-বাবার কাছ থেকে সেই পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে মেঘের দেশে ঘুরে বেড়ানো কোনো রাজকুমারের গল্প শুনেছিল, আর এদিকে, সেইসব রাতে সিদ্ধার্থ কেবল তার মা-বাবার কোন্দলে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছিল। নির্মল ঠিক বুঝতে পারে, বাইরের আপাত কঠিন বেপরোয়া সিদ্ধার্থেরও একটা স্পর্শকাতর সুন্দর কোমল মন ছিল, হয়তো এখনো তা আছে, গোপনে কোথাও- নিরালম্ব, নিরাশ্রয় সেই মনটি অথৈ দুঃখে বুঝি বা সম্বৎসর ছটপটাচ্ছে।
এতকাল জোর করে বেঁধে রাখা কথার প্রবল স্রোত যেন আচমকাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। সিদ্ধার্থ সব কথাই বলে গেল- তার দুঃখ, যন্ত্রণা, একাকীত্ব এবং চোখের জলের আস্ত দস্তাবেজ। নিজেকে মুক্ত করে দেবার মতো নির্মলের ছদ্মবেশে সে যেন একটা অপ্রত্যাশিত অবলম্বন পেয়ে গেল। সিদ্ধার্থ অকপটে বলে গেল তার মা-বাবার বিচ্ছেদ থেকে আরম্ভ করে ড্রাগস আসক্ত হবার সকল করুণ কাহিনি। স্পর্শকাতর আবেগে তাড়িত, এক সতেজ বালকের নিষিদ্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন অপরাধ জগতের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার, বেদনাভরা সুদীর্ঘ আখ্যান। একসময় সিদ্ধার্থ তার গল্প সমাপ্ত করে বলল-
'বেলা চলে গেল। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।'
ওপারের ঘরগুলোতে দুটো-একটা করে বাতি জ্বলে উঠল।
'সূর্য ডোবে। অন্ধকার হয়। তবুও এই আশা জায়মান থাকে, যে, কাল আবারও সূর্য লাল হয়ে পুবাকাশে দেখা দেবে। সূর্য ডোবে, আঁধার ঘনায়- এটাই একমাত্র সত্য নয়। একই সময় অন্য কোথাও সূর্যোদয় ঘটে, সেখানে আলো জাগে- তাও সত্য। নির্মল মনে মনে এসব ভাবছিল।
নির্মল লক্ষ করল- সিদ্ধার্থ অন্ধকারে রহস্যময় হয়ে ওঠা সেই নদীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। হয়তো অন্ধকার চিরকালই রহস্যময়। নির্মল বলতে শুরু করল- 'একটা সমস্যা থেকে পালিয়ে বেড়িয়ে তুই নেশাগ্রস্ত হয়ে ভাল করিসনি। বরং নতুন আরেকটা সমস্যায় জড়িয়ে গেলি।'
একটু থেমে নির্মল আবার সিদ্ধার্থকে বলল, 'তোকে কিন্তু এইসব ছাড়তে হবে সিদ্ধার্থ।'
হয়তো এসব কথা অনুরোধ মাত্র নয়, তার সঙ্গে আছে ভালবাসা, শাসন। সবকিছুর মিলিত মিশ্রণ। বেশ চিন্তিত হয়ে হতাশ স্বরে সিদ্ধার্থ একরকম অসহায়ভাবে নির্মলকে বলে ওঠে- 'খুব সহজ নয় রে। আজ আমি ড্রাগস খাইনি। দেখ তো- আমার হাত পা-গুলো কেমন কাঁপছে।'
নির্মল দেখতে পেল -সত্যিই সিদ্ধার্থর হাত পা-গুলো যেন ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছে। এমনকী তার কথাও যেন জিবে জড়িয়ে যাচ্ছে।
'সহজ নয়, জানি। হয়তো ড্রাগসের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে তোর। পত্র-পত্রিকায় আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম জানিস। ড্রাগসের এই ভুল পথ মানুষকে অকাল মৃত্যু এবং অপরাধ জগতের দিকে টেনে নিয়ে যায়।'
'জানি, হয়তো আমিও সেই পথেই এগোচ্ছি'- একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিদ্ধার্থ বলল। আতঙ্কের পরিবর্তে তার মুখমণ্ডল জুড়ে যেন হতাশার ছায়া খেলা করছে।
'দাঁড়া, এত শিগগির ভেঙে পড়লে কেমন করে চলবে?'- নির্মল সিদ্ধার্থকে ধমকের স্বরে বলল। একটা পথ সে খোঁজে- 'আমি একা হয়তো পারব না। হয়তো তোর ডাক্তারের প্রয়োজন পড়বে। কথাগুলি কাউকে না কাউকে আমায় বলতে হবে।'
সিদ্ধার্থ আতঙ্কিত হবার ভঙ্গিতে বলে উঠল- 'বলিস না বলিস না, কাউকে বলিস না।'
'দাঁড়া, ভয় করেলে কী হবে। মহেন্দ্র স্যারকে বলব না। বললেই তোকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবেন। সেটা কোনো সমাধান হতে পারে না। কথাগুলি অনুভব স্যারকে বলব। তিনি হয়তো বুঝতে পারেন, বুঝতে পারবেন। তিনি একটা রাস্তা বের করবেন, এটা আমি জানি।'
সিদ্ধার্থ এবার আর কোনো প্রতিবাদ করল না। অনেকদিন বাদে কারও অশ্রয়ে তার বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করছে।
'আসল কথা কি জানিস? মন! তুই বলছিলি জীবনটাই তোকে প্রবঞ্চনা করেছে। জীবনকে ভালবাসলে জীবন কখনো প্রবঞ্চনা করে না। এই নদী, পাহাড়, মাথার ওপরের আকাশ, চাঁদ, তারা, মন চাইলেই এদের ভালবাসতে পারি, আপন করে নিতে পারি। এইসব যাঁরা ভালবাসেন তাঁরা কখনো নিঃস্ব হন না। বস্তুত মন চাইলেই সুখী হতে পারি, জানিস। প্রকৃতির জগৎখানি যেমন করে আছে, ঠিক তেমনই আছে গানের জগৎ, বইয়ের জগৎ। গান তুই গাইতে না-পারতে পারিস, গল্প, উপন্যাস না-লিখতে পারিস- কিন্তু মন চাইলে, সুন্দর সুন্দর গান শুনতে পারিস, সুন্দর সুন্দর কবিতা পড়তে পারিস!'
কথাগুলি নির্মল কি নিজেকেই বলে চলেছে না সিদ্ধার্থকে লক্ষ করে বলছে সে-কথা ও বুঝে উঠতে পারেনি। সিদ্ধার্থ বেশ অনুধাবন করতে পারছে তাদের এই বন্ধুটি যেন তাদের চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়, চোখের সামনেই সে রয়েছে অথচ মনে হচ্ছে অচেনা মানুষ।
'সকল মানুষের জীবনই যেন এক-একটা লড়াই। যুদ্ধ। সেই লড়াইয়ে হয়তো জীবনের আমেজ হয়তো লড়াইটাই জীবন! নিয়মের মধ্যে থেকেই লড়াইটা লড়ে যেতে হবে। নিয়মের বাইরে খেলতে গেলেই নিজেকেই বাজাতে হবে রেফারির হুইসেল।'
রহস্যঘন নদীর দিকে চেয়ে নির্মল এই কথাগুলি বলে গেল-
'আগামী সপ্তাহে আমি বাইরে যাব- বেশ কিছুদিনের জন্য। আমার শরীরে জটিল একটা রোগ বুঝলি। আমিও লড়াই করছি। সবাই তাই করে- কেবল সকলের লড়াইটা আলাদা।'
নির্মলের জটিল রোগের আকস্মিক খবরের প্রচণ্ড আঘাতে নির্বাক নিঃস্পন্দ হয়ে গেল সিদ্ধার্থ। কি বলবে ভেবে উঠবার আগেই নির্মলের কণ্ঠের কোমল শব্দগুলি অন্ধকার উজিয়ে তার কানে আবারও বেজে উঠল-
'বাধা দেবার জন্যে, বোঝাবার জন্যে, সাহস যোগাবার জন্যে যদি আমি না-ও থাকি তুই কিন্তু আর ওই পান দোকানে যাস না।'
সিদ্ধার্থর বুকটা মুচড়ে উঠল। সে বেশ অনুভব করতে পারল, এই অনুরোধের উত্তর তাকে দিতেই হবে।
নির্মলের হাতটা আঁকড়ে ধরে ঢোক গিলে সিদ্ধার্থ বলে-
'আমি নিশ্চয় চেষ্টা করব নির্মল। চোখের সামনে না-থাকলেও আমার বুকের ভেতরে থেকেই তুই বাধা দিবি, তা আমি জানি।'
নির্মলের মুখমণ্ডল জুড়ে একটা কোমল স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মহেন্দ্র মাস্টারকে চোখ রাঙিয়ে ভেংচে ওঠা ছেলেটিও এভাবে কথা বলতে পারে? একটু আগে সিদ্ধার্থ নির্মলকে বলছিল- ওর ভেতরের মানুষটা সে কবেই মরে গেছে। উঁহু, ভেতরের মানুষটা কখনো মরে না। হয়তো কখনো একটু ঘুমিয়ে পড়ে।
সেই ঘুমিয়ে পড়া মানুষটিকে কেউ না কেউ জাগিয়ে দিত হয়।
সিদ্ধার্থ যে হাত আঁকড়ে ধরেছিল, নির্মলের, তা কেঁপে কেঁপে উঠছে- নেশাসক্তির দরুন নয়, সিদ্ধার্থ
বুঝি বা কাঁদছে- বুঝি তার দুচোখ ভরে উঠেছে অশ্রুতে- গাঢ় অন্ধকারে তা অনুমান করা দুষ্কর।
অন্ধকারে যদি নীরবে ঝরে পড়ছে, দু-এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু, ক্ষতি কি!