রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৪। রামের বনে গমন। বিবাহের পর সকলে অযোধ্যায় ফিরে এলে রাজমাতাগণ পুত্র ও পুত্রবধুদের বরণ করে নিলেন। কয়েকদিন পর ভরত ও শত্রুঘ্ন মামা বাড়ি গেলেন এবং রাম ও লক্ষ্মণ পত্নীসহ সুখে বাস করতে লাগলেন। রাজা দশরথ রামকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সে উপলক্ষে অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তখন কৈকেয়ীর পিত্রালয় থেকে আগত মন্থরা নামক এক কুব্জা দাসী কৈকেয়ীকে মন্ত্রণা দিলেন যে, দশরথ রামকে অভিষিক্ত করলে কৈকেয়ীর গর্ভজাত ভরত কখনই রাজা হতে পারবে না বরং সে রামের দাস হয়ে থাকবে। মন্থরার এই রকম কুবুদ্ধিতে বশিভূত হয়ে কৈকেয়ী রাজা দশরথের নিকট দুইটি বর চাইলেন। রামের পরিবর্তে ভরতের অভিষেক হোক এটা ছিল তাঁর প্রথম বর এবং রাম মৃগচর্ম পরিধান করে তপস্বী হয়ে চৌদ্দ বৎসর দণ্ডকারণ্যে বাস করুক এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বর। এই বর প্রার্থনার একটা ইতিহাস আছে। একবার দেবাসুরের যুদ্ধে কৈকেয়ী তাঁর রণ-কৌশল আর বুদ্ধিমত্তার দ্বারা দশরথের প্রাণরক্ষা করেছিলেন। দশরথ তখন খুশি হয়ে কৈকেয়ীকে দুটি বর দিতে চেয়েছিলেন। কৈকেয়ী সে বর তখন চাননি। তাই এখন স্বার্থসিদ্ধির জন্য সে ঐ বর চাইলেন। রাজা দশরথ কৈকেয়ীর ঐ কথা শুনে মুছির্ত হলেন। জ্ঞান ফিরে আসার পর তিনি কৈকেয়ীকে শত বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। অবশেষে তিনি কৈকেয়ীর শর্ত মেনে নিয়ে রামকে কাছে ডাকলেন। কৈকেয়ী তাঁর বরের কথা রামকে খুলে বললে রাম অকপটে সব শর্ত মেনে নিলেন এবং শীঘ্রই বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। রামের বনে যাওয়ার কথা শুনে দশরথ মুর্ছিত হয়ে পড়লেন। রামের মুখে সবকথা শুনে লক্ষ্মণ ক্রোধান্বিত হন এবং রামকে জোড়পূর্বক রাজ্য অধিকার করতে বলেন। কিন্তু পিতৃভক্ত রাম পিতা দশরথের আদেশ অমান্য করে রাজ্য অধিকার করে সুখভোগ করার চেয়ে বনে গমন শ্রেয় মনে করলেন। রাম সীতাকে মাতা কৌশল্যা ও পিতা দশরথের সেবার জন্য রেখে বনে যেতে চাইলেন। কিন্তু পতিব্রতা সীতা পতি রামকে ছেড়ে থাকতে অসম্মত হলেন এবং তিনিও রামের সাথে বনে গমন করতে চাইলেন। রাম তাঁকে বোঝালেন যে, বনে বাস করা অনেক বিপদজনক এবং তাঁর মত কোমলমতী নারীর পক্ষে তা অসম্ভব। কিন্তু পতিব্রতা সীতার নিকট পতিকে ছাড়া সংসারে সুখভোগের চেয়ে পতির সাথে বনে গিয়ে দুঃখেভোগই শ্রেয়। তাই সীতার সঙ্কল্পের কাছে নত হয়ে রাম সীতাকে বনে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। শুধু সীতা নয় লক্ষ্মণও রামের সাথে বনে যাওয়ার সঙ্কল্প করলেন। বনে যাওয়ার পূর্বে রাম পিতা দশরথের কক্ষে গেলেন। দশরথ রামকে বনে যেতে নিষেধ করেন এবং তাঁকে বন্দি করে রাজ্য অধিকার করার কথা বলেন। জোরপূর্বক রাজ্য অধিকার করা ক্ষাত্রধর্মের বিরোধী নয়। কিন্তু রাম যদি জোরপূর্বক রাজ্য অধিকার করেন, তবে কৈকেয়ীকে দেয়া দশরথের বর নিষ্ফল হবে। বর নিষ্ফল হলে দশরথের মান ও ধর্ম দুটোই নষ্ট হবে। তাই রাম পিতা দশরথের মঙ্গলের কথা ভেবে বনে গমনের সিদ্ধান্ত নিলেন। বনে গমনের পূর্বে রাম ব্রাহ্মণগণকে এবং মন্ত্রী চিত্ররথকে ধেনু, ধন-রত্ন, বস্ত্র, যান ও দাসী দান করলেন। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ, পিতা, মাতা ও বিমাতাদের প্রণাম করে রথে আরোহনপূর্বক বনের উদ্দেশ্যে রওনা করলেন। সুমন্ত হলেন তাঁদের রথের সারথী। বহু অযোধ্যাবাসীরা তাঁর রথের পিছনে পিছনে তমসা নদীর তীর পর্যন্ত গেলেন। সেখানে সবাই একরাত্র কাটানোর পর রাম সকলের নিদ্রাভঙ্গের পূর্বেই সে স্থান হতে বনের দিকে দ্রুত গমন করলেন। অযোধ্যাবাসীগণ নিদ্রাভঙ্গের পর রামকে না দেখতে পেয়ে বিলাপ করতে করতে অযোধ্যায় ফিরে এলেন।