Young Bengali Narrator
por Gemini Ai proকী এমন অপরাধ করলে একজন মা নিজের গর্ভধারিণী সন্তানের মৃতদেহ নিতে অস্বীকার করেন? কী এমন পাপ করলে একজন জন্মদাত্রী বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, ও যা করেছে, তার জন্য এই মৃত্যুই ওর পাওনা ছিল? মৃতদেহটা তোমরা যেখানে খুশি ফেলে দাও। আমি ওর মুখ দেখতে চাই না।
এই কথাগুলো কোনো কাল্পনিক সিনেমার সংলাপ নয়। বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া এক বাস্তব শিহরণ। ঘটনাটি বারুইপুরের। যেখানে এক এগারো বছরের ছোট্ট মেয়ের জীবন এক নিমেষে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। আর তারপর যা ঘটল, তা গোটা বাংলাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। আজ আমরা সেই অন্ধকার রাতের গল্প বলব। যে রাত শুরু হয়েছিল এক পৈশাচিক অপরাধ দিয়ে, আর শেষ হয়েছিল বারুদ আর রক্তের গন্ধে।
দিনটা ছিল চৌঠা জুলাই। অন্য আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই। কিন্তু বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকার একটি পরিবার জানত না, তাদের জীবনে এক ভয়াবহ কালবৈশাখী ঘনিয়ে আসছে। তাদের এগারো বছরের ফুটফুটে মেয়েটা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যায়। চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পাড়াপড়শি থেকে শুরু করে বাড়ির লোক, সকলেই হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে। উদ্বেগ। আতঙ্ক। উৎকণ্ঠা। রাত পেরিয়ে সকাল হয়। কিন্তু মেয়ে ফেরে না।
তারপর আসে পাঁচই জুলাই। সূর্যপুর হাটের কাছে একটি শান্ত পুকুর। সেই পুকুরে ভাসতে দেখা যায় একটি বস্তা। বস্তা খুলতেই শিউরে ওঠে মানুষ। বেরিয়ে আসে সেই এগারো বছরের ছোট্ট মেয়ের নিথর দেহ। তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তারপর পাথরে থেঁতলে বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়া হয়েছে পুকুরের জলে।
খবর ছড়াতেই গোটা এলাকায় যেন আগুন জ্বলে ওঠে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ে রাস্তায়। মানুষ বিচার চেয়ে রাস্তায় নামে। টায়ার পোড়ানো হয়। পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চলে। বারুইপুর-জয়নগর রাস্তা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। জনতার একটাই প্রশ্ন। এই পৈশাচিক কাজ কে করল? কে সেই রাক্ষস?
খুঁজতে খুব বেশি সময় লাগেনি। নাম প্রভাস মণ্ডল। বয়স চল্লিশ কি বিয়াল্লিশ। এলাকার মানুষ তাকে কোনোদিনই ভালো চোখে দেখত না। মদ্যপ অবস্থায় পড়ে থাকা, পরিবারের ওপর অকথ্য অত্যাচার করা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে গালিগালাজ। এই ছিল তার রোজকার রুটিন। তার নিজের স্ত্রীও তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কলকাতায় পরিচারিকার কাজ করতেন। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এই লোকটার ভেতরে লুকিয়ে আছে এতটা নিষ্ঠুর এক খুনি।
পুলিশের খাতায় আসার আগেই, ওই নিখোঁজ হওয়ার রাতেই এলাকার মানুষ সন্দেহ করেছিল প্রভাসকে। স্থানীয় শান্তনু মণ্ডল নামের এক ব্যক্তি তাকে ধরে ফেলে। শুরু হয় জেরা। একটি চলন্ত টোটোয় বসে শান্তনুর মোবাইলে রেকর্ড হতে থাকে প্রভাসের প্রথম স্বীকারোক্তি। সেই ভিডিওতে প্রভাসের গলায় কোনো অনুশোচনা ছিল না। চরম নির্লিপ্তভাবে সে বলতে থাকে তার অপরাধের কথা। সে জানায়, তারা চারজন ছিল। আনন্দ নামের একজন ছিল তার সাথে। তারা মেয়েটিকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিপণ। মাত্র পাঁচশো টাকা চেয়েছিল তারা। কিন্তু মেয়েটি তাদের চিনে ফেলায় পরিস্থিতি বদলে যায়। গলা টিপে, পাথর দিয়ে আঘাত করে খুন করা হয় তাকে।
প্রভাস যদি সেদিন ক্ষুব্ধ জনতার হাতে পড়ত, হয়তো তখনই তাকে পিটিয়ে মারা হতো। কিন্তু শান্তনু তাকে পিছনের রাস্তা দিয়ে সোজা তুলে দেয় পুলিশের হাতে। বেঁচে যায় প্রভাস। কিন্তু সেটা ছিল এক অন্য পরিণতির শুরু মাত্র।
পুলিশের হেফাজতে আসে মূল অভিযুক্ত। শুরু হয় লাগাতার জেরা। কিন্তু পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে এই ধুরন্ধর অপরাধী। একেকবার একেক কথা বলতে থাকে সে। বয়ান বদলায় বারবার। কখনো বলে সে নিজে খুন করেনি, আনন্দ করেছে। কখনো বলে তারা শুধু মেয়েটিকে তুলে এনেছিল। তদন্তকারী অফিসারদের বিভ্রান্ত করার এক চরম নোংরা খেলা খেলছিল সে।
পুলিশ বুঝতে পারে, এই জট সহজে খোলার নয়। আসল সত্যিটা বের করতে হলে ওকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে হবে। আইনের ভাষায় যাকে বলে ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন। অর্থাৎ ঠিক কীভাবে সেদিন রাতে ঘটনাটা ঘটেছিল, কোথা থেকে মেয়েটিকে তুলেছিল, কোথায় খুন করেছিল, তা মিলিয়ে দেখতে হবে।
দিনটা মঙ্গলবার। রাত তখন ঘড়ির কাঁটায় বারোটা পেরিয়ে গেছে। পৌনে একটা বাজে। চারপাশ নিস্তব্ধ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বারুইপুর থানা থেকে পুলিশের একটি দল প্রভাসকে নিয়ে রওনা হয় সূর্যপুরের সেই পুকুর পাড়ের দিকে। স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিটের সদস্যরা ছিলেন সেখানে। উদ্দেশ্য ছিল ঘটনার নিখুঁত পুনর্নির্মাণ।
কিন্তু প্রভাসের মাথায় তখন ঘুরছিল অন্য ছক। সে জানত, এটাই তার পালানোর শেষ সুযোগ। অন্ধকারের মধ্যে সে খুঁজছিল একটা মোক্ষম মুহূর্ত। সূর্যপুরের ওই নিস্তব্ধ এলাকা। চারপাশে ঝোপঝাড়। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রবল ঝটকায় পুলিশের এক আধিকারিকের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেয় প্রভাস। সিট সদস্য রনি সরকার নামের ওই পুলিশ অফিসারের রিভলভার তখন অপরাধীর হাতে। প্রভাস মরিয়া। সে পুলিশের দিকে তাক করে সোজা গুলি চালায়।
অন্ধকারের বুক চিরে শোনা যায় গুলির শব্দ। পুলিশ থমকে যায়। কিন্তু তারা অপ্রস্তুত ছিল না। আত্মরক্ষার অধিকার। যখন নিজের বা সঙ্গীর প্রাণ বিপন্ন, তখন গুলি চালানোর অধিকার পুলিশের আছে। পাল্টা পজিশন নেয় পুলিশ বাহিনী। সিট সদস্য অর্ঘ্য মণ্ডল আর দেরি করেননি। তিনি ট্রিগার চাপেন। পরপর দু রাউন্ড গুলি ছুটে যায় প্রভাসের দিকে।
প্রভাসের ডানদিকের বুক আর পেটে গিয়ে লাগে সেই অব্যর্থ গুলি। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেই অপরাধী। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি দ্রুত ছোটে বারুইপুর হাসপাতালের দিকে। কিন্তু সব শেষ। চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বারুইপুরের আকাশে তখন ভোরের আলো ফুটছে। এক ধর্ষক ও খুনির জীবনের চিরস্থায়ী অবসান।
কিন্তু এই আখ্যান এখানেই শেষ নয়। সকালবেলা পুলিশের তরফ থেকে খবর যায় প্রভাসের বাড়িতে। জন্মদাত্রী মায়ের কাছে খবর পৌঁছায়, তার ছেলে পুলিশের এনকাউন্টারে মারা গেছে। হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ আনতে হবে।
ঠিক এইখানেই ঘটে সেই চমকে দেওয়া ঘটনা। যে মা তাকে জন্ম দিয়েছেন, সেই মা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তিনি ওই মৃতদেহ ছুঁয়েও দেখবেন না। তার গলা কাঁপছিল না। চোখে এক ফোঁটা জল ছিল না। ছিল শুধু একরাশ ঘৃণা আর বিরক্তি। তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ও যে পাপ করেছে, তার এই শাস্তিই দরকার ছিল। আমি মৃতদেহ নেব না। পুলিশের যা ইচ্ছে তাই করুক।
ওর স্ত্রীও একই কথা বলেন। গোটা সূর্যপুর গ্রামের মানুষ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আপদ বিদায় হয়েছে। কেউ দেখতে চায় না ওই অপরাধীর মুখ।
প্রভাসের এই পরিণতি শুধু বারুইপুরে নয়, গোটা বাংলায় এক অদ্ভুত অনুরণন তৈরি করে। কামদুনি, হাঁসখালি, মাটিগারা, গুড়াপ। যেখানে যেখানে এমন নৃশংস ঘটনা অতীতে ঘটেছে, সেখানকার নির্যাতিতাদের পরিবারগুলো যেন একটু হলেও স্বস্তি পায়। তারা প্রকাশ্যে বলে ওঠে, ঠিক হয়েছে। এমন এনকাউন্টারই দরকার। বছরের পর বছর আদালতে ঘুরেও যখন বিচার মেলে না, তখন অন্ধকারের এই বিচার যেন মানুষের মনে এক অদ্ভুত ভরসা এনে দেয়।
আইনের শাসন নাকি তাত্ক্ষণিক বিচার? এই বিতর্ক হয়তো সমাজতাত্ত্বিকরা চালিয়ে যাবেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ, আর ওই এগারো বছরের শিশুটির হারানো পরিবারের কাছে এটা হয়তো শুধুই একটা যোগ্য শাস্তি। যেখানে অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি।
রাতের অন্ধকারে যে পুকুর পাড়ে সে এক নিষ্পাপ জীবন কেড়ে নিয়েছিল, সেই একই অন্ধকারে তার নিজের জীবনেরও হিসাব চুকিয়ে দেওয়া হলো চিরতরে। প্রকৃতির বিচার বড় অদ্ভুত। সব অপরাধের শাস্তি আদালতের চৌহদ্দিতে হয় না। কিছু বিচার রাতেই সম্পন্ন হয়। আর কিছু পাওনা কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেয় স্বয়ং মৃত্যু।